| | | | | | | | | |

Canvase by Aniruddha Bose

Canvase
copyright Canvase
by Aniruddha Bose 

Fiction, Bengali
Hardbound, 352 Pages, 404 gms
About: Canvase, Aniruddha, Bose, bestseller, colour, spectrum, female, facets, short, story, novel, post, mordern

Price: Rs 400/- or US $15

ভিবজিওর শব্দটার অর্থ আমাদের সবারই জানা। সূর্যের সাদা আলোর বর্ণালির সাত রং-এর ইংরেজি আদ্যক্ষরগুলিকে পরপর সাজালে এই শব্দটি পাওয়া যায়। তার মানে সাদা রং ভেঙে এই সাতটি রং মেলে। বিপরীত ভাবে দেখলে, সাতটি বিভিন্ন রং মিলে তৈরি হয় সাদা রং।

পিওর ম্যাজিক!

আবার এই দৃশ্যমান রং-এর জগতের ওপারে আছে এক রংহীন জগৎ, অতি বেগুনি আর লাল উজানি আলোর এক ভিন্ন রাজ্য। সেখানে পৌঁছতে পারলে কোথায় রং? মানুষের চোখ সেখানে হয়ে পড়ে অকেজো। অনুভূতির অন্য স্তরে সেখানে বিরাজমান অন্য ইন্দ্রিয়ের অনন্য অনুভূতি।

মানুষও ঠিক এ রকম নয় কি? প্রতিটি মানুষের চরিত্রই তো কত রকম রং-এর, সাত বা সাতাত্তর, কেউ কি খেয়াল করে? কখনো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একটি বিশেষ রং, আর দর্শকরা বলে ‘বাঃ!’ কখনো বা ঝলসে ওঠে অন্য কোনো রং, আর সেই দর্শকরাই অবাক হয়ে বলে ‘আরে, এরকম তো আগে দেখিনি!’ আসলে সবই তো সেই জীবন নামক প্রিজমের খেলা। একই জন, বিভিন্ন প্রকাশ। আরও গভীরে যদি কেউ ডুব দেয়, তবে হয়তো পৌঁছে যাবে সেই রং-এর ওপারের অপ্রকাশ জগতে, যেখানে একজন বর্ণময় মানুষ হয়ে ওঠে অবচেতনের আবছায়া।

এই যে মানব চরিত্রের রং-এর খেলা, এটা দেখার এক টুকরো খোলা জানালা অনিরুদ্ধ বসুর এই উপন্যাসটি। অনিরুদ্ধ বরাবরই নতুন নতুন আঙ্গিক নিয়ে লেখে। লেখা নিয়ে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করে। এই উপন্যাসটি এক নতুন ধারায় লেখা। একই নারীকে নিয়ে সাতটি ছোটগল্প, আর তারপর সব মিলে মিশে একটি উপন্যাস – এ যেন সেই সাত রং-এর খেলা। ভিবজিওর মিলে মিশে সাদা।

তারপর কেন্দ্রীয় চরিত্রটি (প্রথাগত নায়িকা বলতে আমার কুণ্ঠা হচ্ছে!) এক সময় খুঁজে পায় তার রঙিন বাইরের খোলসের অন্দরের গভীর বর্ণহীন অন্তর্সত্ত্বাকে। এ যেন ভিবজিওরের ওপারের অতি বেগুনি বা লাল উজানি আলোর খোঁজ পাওয়া।

জানি না, আর কেউ এ ভাবে মানবী চরিত্র বিশ্লেষণ করে উপন্যাস লিখেছেন কি না। তবে বাংলা ভাষায় আমরা যারা মেন স্ট্রিমের বাইরে দাঁড়িয়ে, নতুন কিছু বলার বা লেখার চেষ্টা করছি, তারা স্বতঃস্ফূর্ত সাধুবাদ জানাচ্ছি অনিরুদ্ধকে, তার এই অসাধারণ প্রচেষ্টার জন্য।

আশা করি মননশীল পাঠকরাও একমত হবেন।

 

দুর্গাপুর

আগস্ট ২০১৪                      আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

Publications of Aniruddha Bose:

Anweshan

Dekha (Third Edition)

Nishabde (Second Edition)

Chakra (Second Edition)

Tomake (Second Edition)

The Vision

Pursuit (Second Edition)

Fulcrum

Quest

Canvase

The Moment

Sfulinga

Canvas

Eternal Mayhem

Alo Andhar

Conundrum

Shadow

Prohelika

Complete Works of Aniruddha Bose (Volume 1)

Complete Works of Aniruddha Bose (Volume 2)

Complete Works of Aniruddha Bose (Volume 3)

If...

Complete Works of Aniruddha Bose (Volume 4)

Murder In The Time of Corona

Spark

Complete Works of Aniruddha Bose (Volume 5)

Anusaran

Murder@Corona.Time

Eka Onyo

Reviews

Dear Aniruddha
I took time in finishing 'Canvas' because there is so many nuances in this novel. Your style is extraordinary. There is so many aspects of the mental and material worlds in this book, that are mind-boggling. I am sure the book is widely appreciated. Love.
Samirda

-by Dr.Samir Kumar Gupta, FRCS,MCh(L'Pool)


The most remarkable aspect of this book that astonishes you as you flip through the pages is the fact that there are seven short stories about Nandini and then starts the actual novel that intertwines all the seven stories and reveals one of life’s starkest truths. It takes a lot of concentration and deft handling of characters, each reaching a culmination, to write such a novel. I guess it can be said that Aniruddha Bose’s experimental style is unprecedented in Bengali literature may be in English too. Intelligent weaving of situations, emotions and words make it an excellent read. I can say this book would make an equally excellent movie in right hands. Wish to see this on screen someday. All the best. 

-by Purnasree Nag MA


অননুকরণীয় অন্বেষণঃ মনুষ্যত্বের অন্তহীন খোঁজ।।

ক্যানভাসে - অনিরুদ্ধ বসু

(গ্রন্থ আলোচনা)

-অমিয় বন্দোপাধ্যায়

লেখক প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জেন হলেও তাঁর প্যাশন হল লেখা। এ পর্যন্ত প্রকাশিত ৬ খানি উপন্যাস। এর ৪ টি-র ইংরেজি ভাষান্তর হয়েছে - সবগুলোতেই স্বনিষ্ঠ তিনি নানাভাবে নানা ফরম্যাটে সত্যের সন্ধানে মানুষের মনুষ্যত্বের গভীরে আলো ফেলতে চেয়েছেন। আদর্শবাদী সুঅধীত এই সাহিত্যিক প্রত্যক্ষ ও পরীক্ষিত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে ও দেশ-বিদেশের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে এই উপলব্ধিতে এসেছেন - মানুষই প্রতিনিয়ত মানুষের নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। শ্রেয় প্রেয়-র দ্বন্দ্বে প্রেয় প্রাধান্য পেতে পেতে সীমাহীন ভোগসর্বস্ব জীবন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আর একাজে মদত দিচ্ছে কর্পোরেট দুনিয়া। এই দুনিয়ার মানুষের জীবন সম্পর্কে যত কম জানা যায় ততই মঙ্গল; যত কম লেখা যায় ততই বাস্তব সত্যের আর একটা দিক উন্মোচিত হতে চায় - যা হল, মানুষ সব বিষয় শেষ কথা বলতে চাইলেও তা বলতে পারে না কারণ সে নিজেই জানে না, তাঁর অভীষ্ট কী। সৃষ্টির একটা নিজস্ব উন্মোচন-সত্তা আছে যা চিরকাল অধরাই থেকে যায়। কবি সাহিত্যিক শিল্পী এই অধরার দিকেই তাঁদের কালি কলম সব ছেনি হাতুড়ি এগিয়ে নিয়ে যান। এই অন্তহীন যাত্রায় পিছুটান চলে না, অসতর্কতা চলে না। নিষ্ঠা চাই, সততা চাই। অনিরুদ্ধর অন্বেষণে কোনও ভেজাল নেই; লেখালেখি করে পাবার আবিশ্ব-আশা তাঁকে এখনও পর্যন্ত বিচলিত করতে পারেনি। মনুষ্যত্বের অন্তহীন পরাভবের মধ্যে পড়ে এ যুগের মানুষ কেমন আছে, শ্রেণিভুক্ত সমাজস্তর রচনা করে ভোগসর্বস্ব জীবনের অতিপ্রসারে এই মানুষ কোনও শক্তির বলে সমাজ রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কী ভাবে বিধ্বস্ত হচ্ছে - তাঁর উপন্যাসগুলিতে এই ছবি ধরা পড়েছে। প্রশ্ন হল, তবে কি মানব-সভ্যতার প্রসার ঘটেছে না? সভ্যতা শব্দের আসল অর্থ সভার মধ্যে আপনাকে পাওয়া আর সেই সভায় সকলের মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করা। এই সভা শব্দের ধাতুগত অর্থ  - যেখানে আভা, আলোক আছে। বিশেষভাবে বললে মানুষের প্রকাশের আলো একলা নিজের মধ্যে নয়, সকলের সঙ্গে মিলনে। এই আলোর খোঁজই জীবন। অনিরুদ্ধ এই আলোর সন্ধানে আপন সৃষ্টির ভেতর দিয়ে বের হয়েছেন। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ  - তাঁর অনুসন্ধানের দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে একটা সত্যই প্রকাশ করে - মানুষ এখনও মনুষ্যত্ব অর্জনের পথে এগিয়ে চলেছে মাত্র। দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার পুরাণ-কাহিনি, যযাতির পুত্র-যৌবন ধার করে বৃদ্ধ বয়সে সম্ভোগস্পৃহার অগ্নিদহণ; গৌতম বুদ্ধের বোধিসত্ত্বলাভ - এমন অজস্র উপমা উপকরণ প্রাচ্য জীবনের বহমান ছবি। সর্বত্রই একটিই সত্য স্পষ্ট হতে চাইছে - তা হল, মানুষের কিছু হয়ে ওঠার সংগ্রাম। একটি যুগের কণ্ঠস্বর অন্যযুগে অনুরণিত হয়। বহু যুগকণ্ঠ ধারণ করে আছে যে সত্য, তা হল প্রেম মৈত্রী করুণা দয়া দান ত্যাগ তিতিক্ষা সহিষ্ণুতা। সৎ সাহিত্যিক কবি শিল্পী যুগবাণীর উদ্গাতা। এখানে ব্যাপক অর্থে সকলেই শিল্পী। এই শিল্পী প্রতিটি বস্তু বিষয়ের ওপর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োগ করেন। এই দৃষ্টি শুধু জীবনের সমালোচনা নয়, বহিরঙ্গের দিকে তাকানো নয়, বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা দিয়ে, দর্শনের অভিরঞ্জন প্রয়োগ করা হয়, এখানে আত্মার খোঁজই শেষ কথা। এর জন্য অন্তঃক্ষরণ ও আত্ম নগ্নায়ন চাই - শুদ্ধতা চাই। তবে একটা ডিভিনিটি, রচনার প্রসাদগুণ গুণ হয়ে ওঠে। চমৎকারিত্ব দিয়ে, স্পার্ক রচনা করে এই ডিভিনিটি আয়ত্ব করা যায় না। অতলান্ত গভীরতায় উত্তাল সমুদ্রে ঘূর্ণিময় বিপদ-সংকুল যাত্রায় মানুষের একটিই লক্ষ্য - আপনার আত্মার সম্মান।  এই সম্মানে সভ্যতা এক একটি দ্বীপের মতো। স্মৃতিসত্তা যেখানে চিহ্ন রেখে যায় মহাকালের যাত্রাকে অপ্রতিহত রাখতে। অনিরুদ্ধ বুঝেছেন উপন্যাস কোনও তত্ত্ব নয়, শুধুমাত্র শাখাপ্রশাখা সমৃদ্ধ কাহিনি মাত্র নয়। তাঁর সবগুলি উপন্যাসে কাল ও কালজ্ঞানের ভেতর দিয়ে তিনি মানব সম্বন্ধের নানা বর্ণময় ছবি এঁকেছেন। তাঁর রচনার ক্যানভাসে তিনি মনুষ্যত্বের রংটি শেষ পর্যন্ত ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মানুষ কেবলমাত্র প্রাকৃতিক নয়, সে মানসিক। এই মানবিক ভাবানুসঙ্গেই জগত মণ্ডিত হয়। একবিংশ শতাব্দীর জীবনযাত্রায় মানুষের জীবনের রং রূপ কী তা সদ্ভাবে জানার জন্যে সৎ সাহিত্যই রচনা করতে হবে। এ সাহিত্য কী রচিত হচ্ছে? এখন লেখকের হাতে অ্যাজেন্ডা ধরিয়ে দেওয়া হয়, কর্পোরেট চাহিদা না মেটালে সাহিত্যিক হালে পানি পায় না। তাই বর্তমানে সৎ সাহিত্যের আকাল চলছে বলা যায়। অনুমান নয় নিঃসংশয়চিত্তেই এ কথা বলা যায়, এখনকার সাহিত্য পরজীবী। অনিরুদ্ধ এ ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রমি।

ক্যানভাসে উপন্যাসটির ভূমিকায় আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসটির মর্মবানীর নির্যাস যথার্থভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। কাহিনি ছাড়া উপন্যাস হয় না। কাহিনির ভেতর দিয়ে জীবনের সত্য আর্টের সত্য হয়ে ওঠে। ক্যানভাসে এই সত্যটি লেখক অভিনব - আর্টের ফর্ম তৈরি করে মুখ্য চরিত্র নন্দিনীর জীবনে ফুটিয়ে তুলেছেন। নন্দিনীকে নানা বাস্তব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে কর্পোরেট চাহিদা মেটাতে হয়েছে। এই জীবন সংগ্রামের ভেতর দিয়েই প্রেম এসেছে জীবনে। অর্ণব তাকে সাংসারিক বন্ধন দিয়েছে সন্তান দিয়েছে, বেঁচে থাকার আনন্দ দিয়েছে। যখনই নন্দিনী এই আনন্দসুখ পেয়ে জীবনে থিতু হতে চেয়েছে, তখনই এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। অর্ণবের মৃত্যু দুর্ঘটনায়। এখন তার একমাত্র অবলম্বন পুত্র অনীশ ও তার জীবনে চলার পথটিকে সুন্দর করে তোলা কী করে সম্ভব তার খোঁজ করা।

অনিরুদ্ধ সিরিয়াস লেখক এবং বিশ্বজীবনকে আত্মস্থ করে তার এই প্রত্যয় দৃঢ় - বিশ্বের মানুষকে প্রাচ্যের দিকেই মুখ ফেরাতে হবে একদিন না একদিন। তবে সাহিত্য সৃষ্টিতে যে দিকটি তিনি বারবার কম গুরুত্ব দিয়েছেন তা হল, ‘ডেলাইট প্রিন্সিপ্যাল’। ছোট্ট ছোট্ট ডিটেলিং-এর মধ্যে দিয়ে উপন্যাসের প্রাণরস ফুটে ওঠে। এই রসের জোগান উপন্যাস পাঠে পাঠককে প্রাণিত করে, একবার নয় বহুবার পড়তে ইচ্ছে যোগায়। সমকালের হয়েও তাঁর পাঠক সর্বজনীনতা পাবে না, কারণ তিনি সাধারণদের জন্য লেখেন না। তিনি বিশেষ পাঠক শ্রেণির লেখক, যে পাঠক উচ্চশিক্ষিত। শুধুমাত্র মাতৃভাষা জানলে তাঁর উপন্যাসের রস আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। হয়ত এটাই তাঁর লক্ষ্য কারণ যে শ্রেণিকে সাহিত্যে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন - তাদের হাতেই এখন সাধারণ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ। রিয়েলিটির মুঠো শক্ত হাতে ধরে তিনি তাঁদের দিকে আঙুল তুলেছেন যারা মানুষ হয়ে মানুষের হৃদয় কুরে-কুরে খাচ্ছে। মানুষের মধ্যে মানুষের পূর্ণতার রূপটি কী তা ধরা পরছে না। ক্যানভাসে একটি সুখপাঠ্য উপন্যাস হলেও তাঁর ভেতরে মানব মুক্তি পথ কোথায় তার দার্শনিক নির্দেশ রয়েছে। আশা করব অনিরুদ্ধর ভবিষ্যৎ সাহিত্য সৃষ্টিতে অতি সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সহজভাবে সহজভাষায় উঠে আসবে। 

-by Amiya Bandopadhay


নীতা থেকে নন্দিনীঃ অবচেতনের ক্যানভাস

-তন্ময় দত্তগুপ্ত

উপন্যাসের জন্ম ইতিহাস বহু প্রাচীন।

বাংলায় সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী। প্রশ্ন আসতেই পারে সার্থক উপন্যাস কাকে বলে? প্রখ্যাত লেখক মোপাসাঁও স্বয়ং এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। হেনরি জেমস তার সুবিখ্যাত আর্ট অফ ফিকশান প্রবন্ধে বলেছেন “As people feel life, so they will feel the art that is most closely related to it. This closeness of relation is what we should never forget in talking of the effort of the novel”. এই ‘closeness of relation’  উপন্যাসের শিল্প বিচারে প্রধান বিষয়।

উপন্যাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্বন্দ্ব বা conflict। দ্বন্দ্ব গড়ে ওঠার একটি  সাধারণ সূত্র হল Main+Opposition=Conflict. অর্থাৎ মুখ্য চরিত্রের সঙ্গে বিপরীতমুখী চরিত্র বা খল চরিত্রের সংঘর্ষে দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়। এবং এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে উভয়েই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে চায়। এই দ্বন্দ্বের কিছু ভাগ হতে পারে Inner Conflict বা অন্তর্দ্বন্দ্ব, Outer conflict বা বহির্দ্বন্দ্ব এবং Jumping conflict বা আকস্মিক দ্বন্দ্ব। ব্যক্তির নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব; অন্তর্দ্বন্দ্বের অন্তর্ভুক্ত। বহির্দ্বন্দ্ব হল ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দ্বন্দ্ব। আর অনভিপ্রেত ঘটনা বা দুর্ঘটনার ফলে যে দ্বন্দ্ব; তাই আকস্মিক দ্বন্দ্ব। সামাজিক, ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, পৌরাণিক প্রায় সমস্ত উপন্যাসে দ্বন্দ্বের এই প্রকাশভঙ্গী পরিলক্ষিত।

ভূমিকায় এত কিছু বলার কারণ একটাই।

অনিরুদ্ধ বসুর উপন্যাস ক্যানভাসে দ্বন্দ্বের বহুমুখী দিক প্রকাশিত। আর প্রকাশিত হেনরি জেমসের সেই ‘closeness of relation’ যা উপন্যাসের পড়তে পড়তে পর্যাপ্ত।

রাধার পর খাওয়া

খাওয়ার পর রাধা

বাইশ বছর এক চাকাতে বাধা।

চেনা চিরারিত ছক। যেন ক্যানন মেশিনে ফোটোকপি। সংসার, পরিবার, সন্তান উৎপাদন। চেনা দুঃখ চেনা সুখ চেনা চেনা হাসিমুখ। তাই জীবনের যবনিকাও পড়ে চেনা চক্রে। কিন্তু চেনা বৃত্তের বাইরে হাঁটতে চায় কেউ কেউ। তারা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়। তাই তারা ব্যতিক্রমী। নিজস্ব মনের ক্যানভাসে অনুভূতির রঙে তুলি ডুবিয়ে তারা এঁকে যায় একের পর এক ছবি। শূন্য সাদা পাতায় পূর্ণতা দিতে চায় আজীবন।

পূর্ণতা কি আসে? পূর্ণতা কোথায়? অন্তমিলে না অমিত্রাক্ষরে?

ক্যানভাস উপন্যাসের মুখ্যরিত্র নন্দিনী পয়ারের পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে খোঁজেনি দাম্পত্য সুখ। সে বরং অমিত্রাক্ষর কাটিয়েছে জীবন। মেয়েবেলা থেকে  তার চোখে  স্বপ্ন। স্বপ্নে দেখা পুরুষ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে  তিক্ত তির্যক অভিজ্ঞতা। আগুনে আগুন। জ্বলে পুড়ে যায় স্বপ্নের শরীর। প্রেমিক ইন্দ্রনীল, নাচের শিক্ষক ঋতব্রত, এসকোর্ট কম্পানীর ক্লায়েন্ট সকলেই তার শরীরী উত্তাপ পেয়েছে। পায়নি বিমূর্ত মনের সুপ্ত ক্যানভাস। তুমি তো কেবলই কাম; কামনার কোজাগরী - এ যেন গড়পত্তা পুরুষের হস্তাক্ষর। নারী পুরুষের জ্যামিতিক যৌনতার পরেও অপূর্ণতা থেকে যায়। ঔপন্যাসিক অনিরুদ্ধ বসুর এখানেই  আত্মবিবৃতি - “বাৎসায়ন নারী পুরুষের এতো ভঙ্গি এঁকেও মনের ছবি আঁকতে পারেনি”। রামধনুর সাত রঙের মতই জীবনের সাত রাঙা রূপ তুলে ধরেছেন লেখক। এই সাতরূপী নন্দিনী বিচ্ছিন্ন হলেও তা একই জীবনের সপ্ত সুরের মতো। সারা জীবন ধরে সে চেয়েছে তার মনের ক্যানভাস রাঙাতে। উপন্যাসের শেষে সে পেরেছে। সে পেরেছে এই ছবি আঁকতে। রং তুলির নিখুঁত টানে নন্দিনী ছুঁয়েছে আত্মজীবনীর আকাশ। আকাশে আকাশে খণ্ডিত ‘আমি’-র রূপ। নন্দিনী খুঁজে পেয়েছে তার নিজস্ব ‘আমি’। এ যেন ‘তখন তেইশ’ চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র তমোদীপের  অনুভূতি - “চারদিকে ছড়িয়ে আছে  রং। কম্পিউটারের ভি জি এ প্যানেল থেকে বেশি। মোর দ্যান সিক্সটিন মিলিয়ান কালারস। আমার শিল্পী হওয়া কে আটকায়!” গহন অনুভূতির রং-এ স্নাত দুজনেই। নন্দিনী এবং তমোদীপ। একজনের অনুসন্ধান প্রকৃতির মাঝে। অন্যজনের গভীরে। দিগন্ত বিস্তৃত ‘আমি’-র আকাশ। সত্তার সমুদ্রে ডুব দেয় উভয়েই। খুঁজে পায় নিজস্ব ‘আমি’। ধান্দার বিশ্বে বার বার ফাঁদে পড়েছে নন্দিনী। সহজ সরল রৈখিক পথ বদলেছে নিমেষেই। জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে জীবন। জীবনের বাঁকে বাঁকে শুধু শরীরী খেলা। দিকশূন্য র‍্যাট রেস। কেবলই ছুটে চলা। মেঘে ঢাকা তারার নীতা বলেছিল - “দাদা আমি বাঁচতে চাই”। তেমনই করুণ কাতর মনস্বর।

কী যুগ্ম যোগসূত্র!

দুজনেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিপর্যস্ত। সময়ের ব্যবধানে তাদের যন্ত্রণার উৎস ভিন্ন। তবুও নীতা আর নন্দিনী মিলে মিশে যায় একই জীবনের ক্যানভাসে। যেখানে রক্ত আর রং একাকার। নীতা বা নন্দিনীর অহরহ রক্তপাত; সে তো খ্রীষ্টের নিয়তি। নন্দিনী কী এ যুগের নীতা? বা তার স্মৃতির পুনরাবিষ্কার? ক্যানভাস উপন্যাস পাঠে এমন অনেক প্রশ্ন ঝিলিক দেয়।

প্রকৃতপক্ষে অনিরুদ্ধ বসু উপন্যাসের ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। ফেসবুকের এক অচেনা মহিলার বাক্যালাপ থেকে তৈরী তিনশ বাহান্ন পৃষ্ঠার উপন্যাস। নন্দিনীর জীবন কাহিনী বর্ণনা ভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও সরল রৈখিক নয়। জীবনের এখানে বহু বিন্যাস। বিন্যস্ত নন্দিনীর মনস্তত্ত্ব। কী আশ্চর্য পরিসমাপ্তি! উপন্যাসের উপংসহারে লেখকের অকপট স্বীকারক্তি। নিজের সত্তাকে বিযুক্ত করে আয়োজিত লেখক পাঠক কল্পিত কথোপকথন। এ যেন ব্রেষ্টের এলিয়েনেশন।

প্রচ্ছদ শিল্পী অদিতি চক্রবর্তীর রং তুলির মেধাবী উপস্থাপনায় উজ্জ্বল ক্যানভাসের প্রচ্ছদ। বইয়ের ছাপা ও বাঁধাই সর্বাঙ্গীন সুন্দর। দ্বন্দ্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আকস্মিক দ্বন্দ্বের সমাহারে অনিরুদ্ধ বসুর লেখনী উপন্যাসের গতিকে দ্রুত করে। সেই সঙ্গে মুগ্ধ করে লেখকের পোয়েটিক এ্যাপ্রোচ। যার ফলে প্রথম পাঠের পর দ্বিতীয় পাঠের আবেদন জন্মায়। সব শেষে বলি, ক্যানভাস এবং নন্দিনী একে অপরের পরিপূরক হলেও তা ব্যক্তি অতিরিক্ত এক ধারণা।

হয়ত আমাদের অবচেতনের ক্যানভাস।

-by Tanmoy Dattagupta


Canvase Promotion

-by YouTube


Media


Social Media
27-Jul-2020

Social Media
26-Aug-2019

Ekdin
29-Dec-2018

Social Media
12-Jul-2016

Anandabazar Patrika 28th November 2015
28-Nov-2015

Aajker Onyotoma
04-Aug-2015

Saptahik Bartaman
06-Dec-2014

Canvase Review
01-Dec-2014