| | | | | | | | | |

Dhoyashar Kuyasha

 

কবিগুরুর ৭৬তম মৃত্যুদিবসের প্রত্যুষে উঠে টিভিতে রবীন্দ্র বন্দনাঃ

‘তোমারও অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত যত দূরে আমি ধাই

কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথাও বিচ্ছেদ নাই

অপূর্ব কথা। মন ছোঁয়া সুর। অসাধারণ গায়কী।

জন্ম হলে মৃত্যু হবে সবার-ই জানা। মৃত্যু হলে স্বর্গ কি নরকে কোথায় পৌঁছবে অজানা। আগেও শুনেছি, আজকেও শুনলাম। আগে বোঝবার চেষ্টা করিনি। এবার চাইলাম। স্বর্গ নরক কোথায় অজানা। আমার কেন? সকলেরই। কবিগুরুর-ও। মনের কল্পনা বা চলিত প্রথা ছাড়া বাস্তবের চেতনায় কোথায়, জানি না। নশ্বর দেহের প্রাণ ‘পঞ্চভূতে’ বিলীন হওয়ার পর কোথায় যায়, কেউ কী জানে? পৃথ্বী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ। মানে ব্রহ্মাণ্ড বা কসমস। এর মধ্যে কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? ঠিক বুঝে ওঠার অবকাশ হয়নি, যদিও ধার্মিক রীতিনীতি মনে মনে গেঁথে গেছিল। সামাজিক অর্ডার বজায় রাখার জন্যই হয়ত এর প্রচলন। ভালো করলে স্বর্গে, নয়ত নরকে। শব্দগুলো মনে গেঁথে দুর্বল মনকে বাগে আনার অভিপ্রায়।

শুধু এই শব্দ কেন? অনেক শব্দ নিয়ে চিন্তা করতে গেলে ফাঁপরে পড়ি। ইহলোক পরলোক। সীমা অসীম। জীবাত্মা পরমাত্মা। শব্দগুলো মজ্জায় সংস্কারের মতো ঢুকে গেছে। না পারি অস্বীকার করতে। না পারি মানে বুঝতে। সাংসারিক অবচেতন থেকে চেতনাকে অনুধাবন করতে গিয়ে আলোড়ন। বিক্ষিপ্ত মন। খুঁজছে চেতনার আলোকে অবচেতনের সংকীর্ণতা। প্রজ্ঞানন ব্রহ্ম থেকে জাগ্রত চেতনা। দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক বিন্যাস। পঞ্চেনদ্রিয় ধোঁয়াশা। জ্ঞান সজানা। বিজ্ঞান ব্যাখ্যা। সত, রজ, তম-র হাত ধরে থেকে চেতনায়। কবিগুরুর সৃষ্টির দর্শনে অসীমকে পাওয়ার হাতছানি। প্রাজ্ঞানম-ই বুঝি চৈতন্যের উত্তরণ। রিগ বেদের ধ্রুবতারাই ব্রহ্ম কি না জানা নেই। মহাবিশ্বের মহাব্যোমে খোঁজা মানে জাগতিক বলয়ের মধ্যাকর্ষণের বাইরে অজানা অসীম। সেই অজানায় কী চেতনার পূর্ণতা পাওয়া যায়? মানুষ যদি অমৃতাস্য পুত্রাই হয়, ব্রহ্মাণ্ডের ইউনিভার্সাল এনার্জির একাংশ, তবে কোন অজানা অসীমে খুঁজবে উত্তরণের চেতনা? তা কী কেবল মুনি-ঋষিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

আমি মুনি-ঋষি নই। সাংসারিক গেরস্ত। ঘর-সংসার ছেড়ে হিমালয়ে গিয়ে খোঁজা সম্ভব নয়। অহম ব্রহ্মাণী বলে, ঘুমের সময় বা সদ্য জাগ্রত শিশুর জাগরণেই অচৈতন্য। জানা নেই অস্তিত্ব। আধ-চৈতন্য স্বপ্নের ঘোর। জানা, কিন্তু দেখার ক্ষমতা নেই। জাগতিক জাগ্রত ‘চেতনা’ পঞ্চেন্দ্রিয়র আমিত্ব বাসনা। সীমার মধ্যেই খ্যাতি, দ্যুতি থেকে অবলুপ্তি। সেকল বাঁধা সাংসারিক বলয়ে আমিত্বের আস্ফালন। মরে গেলে সব শেষ। পঞ্চেন্দ্রিয় পঞ্চভূতে। মৃত্যুর পর কোন স্বর্গ বা নরকে পৌঁছব, কিংবা আদৌ পৌঁছব  কি না, জেনেই বা আমার কী লাভ? জাগ্রত উপলব্ধির জীবিত অবস্থার মানে থাকলেও, মহানিদ্রায় অর্থহীন। তবে আদিভৌতিক অসীম অজানাকে নিয়ে ভাবনা কেন?

মান্ডুক্য উপনিষদের চেতনার ব্যাপ্তিতেও অসীম অজানা। জাগ্রত স্তরে তো কেবল নিজেকেই দেখা। অস্তিত্বের তারতম্য নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অচৈতন্যের আরেক রূপ। স্বপ্নেও অর্ধ-চৈতন্য। ঘুমের আমি আর বাইরের তারতম্য ভেদে অপারগ। এ কোন জাগতিক বলয়ে মহাজাগতিককে খুঁজছি? গভীর ঘুমের সুপ্তিতে আমিটা আচ্ছিদিত। দেহ, মন, ইন্দ্রিয় অস্তিত্বহীন। তুরীয়তে আত্মজ্ঞান জাগ্রত। আত্মা ব্রহ্ম মিলেমিশে একাকার। যেখানে নিদ্রা, জাগরণ, আপেক্ষিক। এই ইন্দ্রিয়হীন তুরীয়, যদি থাকেও-বা, জাগ্রত আমির ‘ওঁ’ শব্দচ্চারনেই সীমাবদ্ধ। কারণ আমি কোনও স্বয়ংসিদ্ধ পুরুষ নই।  জাগতিক পঞ্চেন্দ্রিয়র মধ্যেই বিচরণ। জ্ঞানের বাণী, ধর্মের শ্লোক, অসীমের অবেগ, আমার মতো সাধারণের কাছে ধোঁয়াশা, কুয়াশা। পাণ্ডিত্যের আধিপত্যে শান্তি, অশান্তির আকারে। শান্তির পথ কী পুঁথির পাতায়? না, হিমালয়ের গুহায়? সংসার ফেলে আলো আঁধারিতে। শান্তি যদি এই কঠিন অজানায়, তার মতো সাধারণ কী করে পাবে তার সন্ধান?

সারাজীবন ধরে যে অজানা অসীমের পেছনে কবিগুরুর রচনাশৈলী, মৃত্যুর এক সপ্তাহ পূর্বে শেষ কবিতায় দীক্ষিত চিন্তাধারা নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখি, সেই চেতনা-ই ইহলোকের পথ। আহাঃ! জীবৎকালে যদি বুঝতেন।

‘তোমার জ্যোতিষ্ক তারে

যে পথ দেখায়

সে যে অন্তরের পথ

সে যে চিরস্বচ্ছ

সহজ বিশ্বাসে সে যে

করে তা’রে সমুজ্জ্বল

...

সত্যেরে সে পায়

আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে

...

শান্তির অক্ষয় আবিষ্কার’

শান্তি তো আমাদের মধ্যেই। ভয়কে জয়ের আত্মদর্শনে। পরম আশ্রয়দায়িনী নিজ মন্ত্রে।

সেখানেই পূর্ণতা।

ইহলোক।

পরলোক।

সব লোকের সমন্বয়ে জাগ্রত অন্তরের মহালোক।

তার প্রণবধ্বণিই ইহলোকের স্বপ্নপুরি। শান্তিময় মহাকাশের ভূলোক।