Rahashya Romancha Series

বাংলা সংস্কৃতির সায়াহ্নে, নিম্ন মেধার মিডিওক্রিটিদের দাপটে সেই সংস্কৃতি যৌবনের অন্তেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে, বার্ধক্য-জাতীয় কোনও বিশেষ পরিণতির তোয়াক্কা না করেই। ‘বাঙালি বা বাংলা’ বিষয়ক আধুনিকতা, বর্তমান ভৌগোলিক বাংলার মাত্র দু-আড়াইশো বছরের উপনিবেশ পর্বের অবদান। 

এই পর্ব একাই মহাভারতের সাপেক্ষে‘আঠারোশো’। তার আর কী-বা দরকার, দুদিক থেকেই? বাঙালি আজ সেই ভেন্টিলেটারে থুবড়ি খাওয়া সাহিত্যের হালহাকিকত জানতেও চায় না। রাবিন্দ্রিক উত্তরীয় জড়িয়ে অশ্রুমোচনেই অস্তিত্ব। ছবি তৈরির ক্ষেত্রে যে বিশ্বব্যাপী একটা বিবর্তন এসেছে, সেটা জানতেও চায় না। জানলেও বুঝতে চায় না। বুঝলেই অস্তিত্ব সংকট! নিম্নমেধার, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। যে করেই হোক টিকে থাকতে হবে। নিজের লেখা গল্প দিয়ে ছবি বানিয়ে অথবা অন্যের লেখা টুকে নিজের নামে চালিয়ে। খোকলা সমাজ এই ডাল-ভাতকে এখন বিরিয়ানি ভেবে গেলে। তাদের উৎকর্ষতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় বইয়ে দেয়। যে সময়টা ঘরে বসে সাধনার সময়, নন্দন কাননে ধান্দাবাজি করে অস্তিত্ব জিইয়ে রাখতে মরিয়া। বাকিটা সময় স্পন্সরড মিডিয়ার পলিটিক্সের চর্বিত চর্বণে ব্যস্ত। সৃষ্টির আগে সেলিব্রিটি হতে হবে। তাই সাত সকালে বোঁচকা কাঁধে বেড়িয়ে পড় মিডিয়া বাবুদের পদলেহন করতে। গতিহীন ঘূর্ণিপাকে চিন্তাশক্তি ফিউজড। হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া ফরগট ইয়েস্টারডে। 

সৃষ্টি ও তার বহিঃপ্রকাশ একেবারেই ভিন্ন। বহিঃপ্রকাশের আড়ম্বরে, সৃষ্টি ব্যাকসিটে। 

এই মিডিয়া হাইপড আধুনিক পরিচালকদের ছবি দেখতে দেখতে কান্না পায়। বেশিরভাগ সময় কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। যুক্তিহীন, গল্পহীন, ফাঁকা ধামাকা। বাকিটা সময় নতুনদের রুখতে মরিয়া। ওরা নতুন কিছু বললে, অস্তিত্ব সংকটে। তাই ওদের হাটাও, নিজেকে বাঁচাতে। বেশিরভাগ তো ছবি করতেই জানে না। যে কটা জানে, গল্প বলতে শেখেনি। আগের দিনে নামি থেকে অনামি পরিচালক সাহিত্য নিয়ে ছবি করত। এখন লিখতে না পারলেও, পরিচালক লেখক হতে চায়। সাধারণ জ্ঞান, যুক্তি, বিজ্ঞান, বিসর্জন দিয়ে, মিডিয়া পুষ্ট হয়ে গেলাতে চায় তাদের উদ্ভট কাহিনি। যেখানে বিশ্বব্যাপী গল্প বলার ক্ষেত্রে একটা গতি এসেছে, সে কথা ভুলে, ছবির টাইমলাইনে সামঞ্জস্য না রেখে, তার বিন্যাস দুর্বিষহ। 

এতগুলো কথা এ কারণে বললাম এক তরুণ পরিচালক অভিরূপ ঘোষের রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ (হইচই) দেখার পর। প্রথম দুটো এপিসোড দেখার পর মনে হল, এ গল্প বলতে জানে। সঙ্গে টাইমলাইনের সামঞ্জস্য বজায় রেখে গল্পের গতি ধরে রাখতে পারে। যেহেতু বিজ্ঞানের ছাত্র যুক্তিগুলো আটুট। 

অন্যান্য ছবি থেকে থ্রিলার বা রহস্য গল্পের বিন্যাস একেবারেই পৃথক। এখানে যুক্তি না থাকলে গল্প দাঁড়ায় না। খুন অনুসন্ধানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটা বিগত কনসেপ্ট। যা একবিংশ শতাব্দীতে খাটে না। প্রাইভেট ডিটেকটিভের এক্তিয়ার নেই তথ্যে প্রবেশ করা। খুন হলে কেউ প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে যায় না। আজগুবি কনসেপ্ট বিদেশ থেকে ধার করা। তাই কনন ডয়েল বা অগাথা ক্রিস্টি, যদিও সে যুগে প্রাইভেট ডিটেকটিভ নামে শোভা পেয়েছে, আসলে ইউগিন ফ্র্যাঙ্কয়েস ডিডকের (১৮৩৩) ইনভেস্টিগেটিভ মেশিনারির একটা চারিত্রিক ব্যাখ্যা মাত্র। সেই আজগুবি চারিত্রিক রূপান্তরের একবিংশ বিবর্তন আবশ্যক। ঠিক তাই করেছে অভিরূপ। ভিন্ন স্বাদে, ভিন্ন আঙ্গিকে। 

একটা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি আর ওয়েব সিরিজের মধ্যে তফাৎ আছে। গল্পটা একবারে বলা, না খেপে খেপে বলা। থ্রিলার লেখকের এখানেই মুনশিয়ানা। একটি অধ্যায় থেকে আরেকটি অধ্যায় – পাঠক বা দর্শককে ধরে রেখে গল্পটা বলা। যাতে পাঠক/দর্শক উদগ্রীব হয়ে থাকে পরের অধ্যায়তে যেতে। 

‘রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ-এর প্রত্যেকটা কিংবা দুটো এপিসোড ভিন্ন ভিন্ন কাহিনি, যদিও প্রথম সিরিজের শেষ দুটো এপিসোড বাদ দিলে সবটাই ‘ঝণ্টু মোটরস’ কেন্দ্রিক। অনেকটা ‘নিকিতা’-র মতো। যেহেতু আমি ঔপন্যাসিক আমি বিচ্ছিন্ন এপিসোডের চেয়ে একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় পছন্দ করি। সেখানে এই সিরিজটা কেমন যেন অসংলগ্ন মনে হয়েছে, যদিও প্রত্যেকটা এপিসোডে গল্প বলা ও গতি লক্ষণীয়। চিন্তাধারার অভিনবত্বও বিশেষ ভাবে দাগ কাটে। দ্বিতীয় সিরিজ অনেক বেশি ম্যাচিওরড। এপিসোডের মধ্যে লিঙ্ক আনার চেষ্টা হয়েছে। সম্প্রতি একটা ওয়েব সিরিজ ‘অসুর’ দেখলাম। এক নতুন আঙ্গিকে বুদ্ধিদীপ্ত কাহিনি। যেটা আমার সব রহস্য উপন্যাসেই থাকে। হয়ত‘অসুর’ ওয়েব সিরিজে রহস্য বলার ধারাটাই পাল্টে দেবে। অভিরূপের কাছ থেকে আমি এরকম উন্নত মানের রহস্য সিরিজ আশা করি। গল্প শেষে ‘টেক হোম’ একটা ম্যাসেজ জরুরি। তার সঙ্গে দর্শনও। তবেই তো তা কালজয়ী হবে। 

বাংলা সংস্কৃতির অচলায়তনে অভিরূপের এই নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ অনেক ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা জাগায়। অন্তত কেউ তো একজন অশ্রুমোচন ও চর্বিতচর্বণ ছেড়ে নতুন কিছু সঠিক ভাবে বলতে চেষ্টা করেছে স্বল্প বাজেটে। সিরিজটা দেখতে বেশ ভালো লাগে। গল্পের বিন্যাস ছাড়াও রুদ্রনীল ঘোষের অসাধারণ অভিনয় মন কেড়ে নেয়। ক্যামেরার কাজ ভালো। আবাহসংগীত আরেক্টু ভালো হলে খুশি হতাম। তবে এডিটিং গল্পটাকে জমিয়ে রাখে। 

অভিরূপের এই নতুন প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। ও আরও ভালো ভালো ছবি আমাদের উপহার দিক এই প্রার্থনা করি। ওর জন্য টেক হোম ম্যাসেজ হিসেবে বহুদিনের বন্ধু, সহপাঠী, সহলেখক আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের একটা কবিতা দিয়ে শেষ করলামঃ   

‘জীবনের ঝরে পড়া ধানগুলো

খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলে স্মৃতির পাখিরা 

ওগো ব্যাধ তুলো না গাণ্ডীব  

তার চেয়ে হও তুমি নীল বাতিঘর  

দেখাও দিশার আলো নিশার আঁধারে’

 

 
Facebook Twitter GooglePlus Wordpress Blogger Linkedin Instagram Tumblr Pinterest Hubpages WhatsApp  © 2000 - 2016 | Cosmetic Surgery in Kolkata | Dr Aniruddha Bose | design by Poligon
This page was generated in -42,761.629 seconds