| | | | | | | | | |

Jouban Tarange

প্রতি অঙ্গে লিখে যাও কসমেটিক সার্জেনের নাম। নাঃ, প্রতি অঙ্গে না হলেও কিছু অঙ্গে তো বটেই। কিন্তু কেন?

মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে বয়সের টানাপোড়ন তো মানব সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই। পিকাসোর মতো চিত্রকারের প্রাঞ্জল তুলির টানেই প্রকট।  তবুও চিরযৌবন মন, ধরে রাখতে চায় হারানো যৌবন। ফিরে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া ক্ষণ। কসমেটিক সার্জারি আর কিছুই নয় - মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে পাঙ্গা লড়া। মাধ্যাকর্ষণ যখন বয়সের সঙ্গে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আপন করে নিতে চাইছে, কসমেটিক সার্জেন সেই নিম্নগামী শক্তিকে থামিয়ে, ফেরাতে চাইছে যৌবনের আঁটসাঁট বাধনকে। নতুন তরঙ্গকে মেশাতে পুরনোর আঙিনায়।

 ভিয়েনিজ সাইকলজিস্ট অ্যালফ্রেড অ্যাডলারের ‘ইনফিরিয়টি কম্পপ্লেক্স’ বর্ণনার প্রেক্ষাপটে উঠে আসে নতুন চেতনা - নিজেকে দেখার - বডি ইমেজ কনসেপ্ট। নিজের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট হলাম। তবেই তো অন্যরা বলবে সুন্দর। সুন্দর হব আমি। এই সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা যুগ থেকে যুগান্তরে কালস্রোতের প্রবাহে পাল্টেছে। বিবর্তন হয়েছে প্যালিওলিথিক যুগ (২১,০০০বিসি) থেকে মহেঞ্জদারো (২৭০০বিসি) অতিক্রম করে ক্যপিটলাইন ভেনাসের (৩২০বিসি) গণ্ডি ছাড়িয়ে ক্লিওপ্যাট্রা (৬৯-৩০বিসি) খাজুরাহ হয়ে আজকে। মানসিক পরিতৃপ্তি মানুষের জন্মগত অধিকার। বয়স যে স্রোতেই ভাসুক না কেন, মন তো চিরযৌবন। তাকে বিগত অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সার্জারির গোরাপত্তন হয়েছিল ১৯২০ তে স্যান কোয়েন্টিনের কারগারে। মানসিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রচলন হয় কসমেটিক সার্জারির।

এই যৌবনের স্খলন, বয়সের প্রথম ধাক্কা মাতৃত্বের দোরগোড়ায়। যখন গর্ভাবস্থায় রিল্যাক্সিন বেরবার জন্য স্তন শিথিল হয়ে যায়। তখনই জেগে ওঠে যৌবনকে ধরে রাখার ইচ্ছে। ম্যাস্টপেক্সি দিয়ে আবার ফিরে যাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া দিনে। একটা কথা ভুললে চলবে না। প্রত্যেক বয়সের স্তনের একটা স্বতন্ত্র আঙ্গিক আছে। তিরিশ বছরের দেহে কুড়ি বছর বয়সের স্তন বেমানান। অজ্ঞান করেই করা হয়। হাসপাতালে দু-দিন থাকা।

 

সঙ্গে পেটের ঝুলে পড়া চামড়াটা? হ্যাঁ, তারও উপায় আছে। অ্যাবডমিনোপ্লাস্টি দিয়ে আবার ফিরে যাওয়া সম্ভব প্রেগনেন্সির আগের অবস্থায়। কিছু কী করা যায়, ফিরে পেতে সেই আঁটসাঁট বাধন? কী করে? নাভির নিচে বাড়তি মেদ কেটে চামড়াটা টেনে নিলেই হল। অজ্ঞান করেই করা হয়। হাসপাতালে দু-দিন থাকা।

 

বয়স একটু বাড়তেই আরেক সমস্যা। নিজেকে আয়নায় দেখতে ভাল লাগে না। চোখের পাতা ভারির জন্য বয়সটা আরও বেশি চোখে পড়ে। কী এমন বয়স? সবে তো চল্লিশ। মধ্যবয়স্কা হয়েও মুখশ্রীতে বার্ধক্যর ছাপ। আবার ছোট কসমেটিক সার্জেনের কাছে। কিছু কী করা যায়, ফিরে পেতে হারন যৌবন? নিশ্চয়ই যায়। চোখের অতিরিক্ত মেদ ও চামড়া বাদ দিলে ফিরে আসে পুরনো দিন। সাবধান! এই অপারেশনের জন্য দক্ষতা প্রয়োজন, কয়েক মিলিমিটার এদিকওদিক হলে কিন্তু চোখ বীভৎস আকার ধারণ করতে পারে। তাই দক্ষ ডাক্তারের কাছে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। অজ্ঞান করেই করা হয়। হাসপাতালে এক-দিন থাকা।

 

এবার পঞ্চাশ পার করে ছুটছে বয়সের ঘোড়া। মানে না কোনও বাধা। গালের চামড়াটা ঝুলে পড়েছে। ফেস লিফট দিয়ে আবার চলে যাওয়া যায় আঠাশের আঙিনায়। অনেক ধরনের ফেস লিফট আছে - স্কিন লিফট, স্ম্যাস লিফট, হামারা লিফট বা কম্পসিট লিফট। স্কিন লিফটের মধ্যাকর্ষণের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা ৫ বছর। কমপ্লিকেশন অনেক বেশি। স্ম্যাসের ১৫ থেকে ২০ বছর। আমি স্ম্যাস লিফট করি। হামারা বা কম্পসিট লিফটের পক্ষপাতী নই। কারণ ওটা ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন কেড়ে নেয়। এখানেও অভিজ্ঞ ডাক্তারের প্রয়োজন। একবার ফেসিয়াল নার্ভের ক্ষতি হলে কিন্তু কোনও ডাক্তারের পক্ষেই আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অজ্ঞান করেই করা হয়। হাসপাতালে তিন-দিন থাকা।

আর বলিরেখা?

প্রচারের দাপটে সবাই বোধহয় এতদিনে বটক্সের নাম জেনে গেছে। যদিও আয়ু সীমিত - ৬ মাস।

 

প্রাচারের দাপটে, কি রোজগারের তাগিদে, যতই প্রোজ্জ্বল হোক কসমেটিক সার্জারি, যতই স্বপ্ন দেখাক বিজ্ঞাপনের পশরা, মনে রাখা বাঞ্ছনিয়, এ বিদ্যে সবার জানা নয়। ডিগ্রি থাকলেও এ গুরুর হাতে শেখা বিদ্যে। এর জন্য কঠোর অধ্যাবসায় প্রয়োজন। সঙ্গে ব্যাবাহারিক প্রয়োগের প্রাক-ইতিহাস জানা না থাকলে, ও পথে না এগোনেই ভাল। চাকচিক্যের আতিসায্যে হারিয়ে না গিয়ে মনে রাখা প্রয়োজন সবাই কিন্তু এ বিদ্যেয় পারদর্শী নয়, যতই সস্তায় আশানুরূপ ফল দেওয়ার স্বপ্ন দেখাক। অভিজ্ঞতাকে কষ্টিপাথরে যাচাই না করে এগোলে, সমূহ বিপদ। অপূরণীয় ক্ষতির আশংকা। যৌবন দূরে থাক, স্বাভাবিকে ফেরত আসা প্রায় অকল্পনীয়। কসমেটিক সার্জারি তখনই সার্থক, যখন কেউ বলবে “বাঃ তোমাকে তো বেশ লাগছে”। আর কেউ যদি প্রশ্ন করে “তুমি কী কসমেটিক সার্জারি করিয়েছ?”, তাহলে ব্যর্থ কসমেটিক সার্জারি।

সৌন্দর্যের সংজ্ঞার বিবর্তন হয়েছে যুগ থেকে যুগান্তরে। দেশের ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে, সভ্যতার হাত ধরে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেকটা প্রবহমান নদীর দু-ধারে গড়ে ওঠা মানব সভ্যতার মতো। পাল্টেছে রং। প্রস্ফুটিত হয়েছে নতুন রূপ। সেই প্রবহমানতায় চিন্তাধারারও পরিবর্তন ঘটেছে। বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মানসিক ব্যাপ্তির পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সঙ্গে চিন্তাধারারও। তখন হয়ত আর যৌবন তরঙ্গে নাচতে ইচ্ছে নাও করতে পারে। বয়সকে মেনে, তালে তাল মিলিয়ে, তার পরিবর্তনকে মেনে নেওয়াও এমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়ত এমনও কোনও দিন আসবে, যেদিন নিজেকে প্রাকৃতিক নিয়মে সঁপে দিয়ে, তাকেই মেনে নিতে হবে ক্ষণ বিবর্তনের পেছনে না ছুটে। স্বাভাবিকতার সংজ্ঞার নতুন দৃষ্টিভঙ্গির স্পর্শে। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, মন খুঁজবে পারসোন্যালিটি, সেক্সুয়ালিটি, ম্যাচিওরিটি, মানসিক বিস্তৃতির উপস্থাপন। এমনও তো হতে পারে রেনি মারগারেটির ‘রেপ’ ছবিটি ভবিষ্যৎ সৌন্দর্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াবে। হারন যৌবনের দিকে তাকিয়ে বিলাপ না করে, যৌবন তরঙ্গে গা না ভাসিয়ে, বর্তমানে সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই শান্তির বীজ লুকিয়ে আছে।